দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের হাতে রয়েছে নানা ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু কয়েক দশক ধরে একটি প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেও দেশটি রামজেটচালিত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। এবার সেই সক্ষমতা অর্জনে ইরানকে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘সি৪৩০এল’ নামের একটি গোপন কর্মসূচির মাধ্যমে ইরানকে উন্নত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে মস্কো। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া বহুবছরের এই কর্মসূচিতে রাশিয়ার অভিজ্ঞ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হয়েছে।
ফাঁস হওয়া রুশ চিঠিপত্র, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি এবং সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে এ কর্মসূচির তথ্য পেয়েছে এফটি। অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পরও কর্মসূচিটি চলতে থাকে।
‘সি৪৩০এল’-এর মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে রামজেট চালনা ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করা। এই ইঞ্জিনের সাহায্যে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির কয়েক গুণ গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি জাহাজবিধ্বংসী ও স্থলভাগে হামলার জন্য ব্যবহৃত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক অস্ত্র শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফাবিয়ান হিনজ বলেন, ‘এটি রাশিয়া থেকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, যা ইরান কয়েক দশক ধরে অর্জন করতে চেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি চালু করতে রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো গতি ও নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ার সক্ষমতার সমন্বয়। এতে উন্নত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য সময় কমে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকায় ইরানের জন্য এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এফটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে রামজেট চালনা ব্যবস্থা তৈরি ও উড্ডয়ন পরীক্ষা করেছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখন পর্যন্ত মোতায়েন করা হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক এবং বর্তমানে জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের কর্মকর্তা জিম ল্যামসন বলেন, ‘ইরানিদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে সক্ষম একটি গুণগতভাবে নতুন কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করবে।’
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, চলতি গ্রীষ্ম পর্যন্তও এই কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলেছে।
‘সি৪৩০এল’ রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের আরও গভীর দিক তুলে ধরছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং রাশিয়ায় এসব ড্রোন তৈরির ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও সহায়তা করেছে। ইউক্রেন ও পশ্চিমা কর্মকর্তারাও অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের সময় রাশিয়া তেহরানকে স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন সহায়তা ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে।
তবে ‘সি৪৩০এল’ কর্মসূচির বিষয়টি আরও গভীর সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। এখানে মস্কো শুধু প্রস্তুত অস্ত্র দিচ্ছে না; বরং ইরানকে নিজস্ব উন্নত কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করছে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, গোপন রামজেট কর্মসূচি দেখায় যে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন অঞ্চলে টেনে আনতে চাইছে।
এই সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা কর্মসূচির ব্যবস্থা করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্ট। তারা প্রকল্পটি নিয়ে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করেছে।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তখন প্রতিষ্ঠানটিকে জাহাজ, সাবমেরিন ও স্থলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ফাঁস হওয়া ভ্রমণসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিকস মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘সি৪৩০এল’ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার আগেই রুশ অস্ত্র রপ্তানি কর্মকর্তারা ও এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী একাধিকবার ইরান সফর করেন।
২০২৫ সালের মধ্যে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়া রামজেট চালনা ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের বিপুল পরিমাণ কারিগরি তথ্য পায়। এরপর রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের একটি উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করেন এবং ব্যবস্থাটি পরীক্ষার সময় কীভাবে কাজ করেছে, তা নিয়ে তেহরানকে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠান।
তারা জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ুপ্রবেশপথ ও ইঞ্জিনের অগ্রভাগে পরিবর্তন নিয়ে জানতে চান। পরীক্ষার সময় উড্ডয়ন-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রামজেট চালু ছিল কি না, সেটিও জানতে চান তারা।
এতে বোঝা যায়, ইরান যে ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করেছে, তার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে রুশ প্রকৌশলীরা সমস্যাগুলো শনাক্ত এবং নকশা উন্নত করতে সহায়তা করছিলেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে রোসোবোরোনএক্সপোর্ট ‘সি৪৩০এল’-এর আওতায় কারিগরি আলোচনার জন্য প্রায় দুই ডজন রুশ বিশেষজ্ঞের একটি প্রতিনিধিদল ইরানে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। একই চিঠিপত্রে সফরের আগে ইরানকে উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্যসংক্রান্ত রুশ প্রকৌশলীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়।
প্রস্তাবিত সফরটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের চালনা ব্যবস্থার কারিগরি বিশ্লেষণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে বলেন, যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে মস্কো ‘আপনাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে’ এবং ‘আপনাদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছে’। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এর আগে ২০২৪ সালে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে উন্নত পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন পুতিন। তখন তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া একই শ্রেণির অস্ত্র বিশ্বের এমন অঞ্চলে সরবরাহ করতে পারে, যেখান থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেশগুলোর সংবেদনশীল স্থাপনায় হামলা চালানো সম্ভব হবে।
ইরানের সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে দেশটি নিজস্ব সামরিক প্রকৌশল, অবৈধভাবে বিদেশি প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং বিদেশি ব্যবস্থা নকল করার মাধ্যমে এই সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে আসছে।
২০১৬ সালে ইরানের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশটি সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে। দুই বছর পর ইউক্রেনে দুই ইরানি কূটনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তারা সোভিয়েত আমলের খ-৩১এ সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন।
২০১৯ সালে ইরানের প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে স্থানীয়ভাবে তৈরি রামজেট ইঞ্জিন দেখানোর ছবি প্রকাশ করে। এরপর ২০২৩ সালের আগস্টে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-সংশ্লিষ্ট তাসনিম সংবাদ সংস্থা দাবি করে, ইরান একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রোটোটাইপ পরীক্ষা শুরু করেছে।
ফাবিয়ান হিনজ বলেন, কার্যকর রামজেটচালিত অস্ত্র তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং অল্প কয়েকটি দেশের কাছেই এ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় জ্ঞান রয়েছে। তার মতে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি হস্তান্তর বলতে অনেকে শুধু নকশা, যন্ত্রাংশ বা পুরো ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বোঝেন। কিন্তু ৬০ বছর বয়সী একজন প্রকৌশলীকে ইরানে পাঠিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে কারিগরি সমস্যা সমাধানে সহায়তা করাও অত্যন্ত মূল্যবান।
ইরানের জন্য এই ইঞ্জিন প্রযুক্তি আয়ত্ত করা ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তির ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের অস্ত্র উন্নত করা এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথও খুলতে পারে।
জিম ল্যামসনের মতে, রুশ প্রকৌশলীরা যদি ইরানের কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তা করতে পারেন, তাহলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে দেওয়া রাশিয়ার সামরিক-প্রযুক্তিগত সহায়তার সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে এটি। এর দীর্ঘমেয়াদি সুফলও ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প পেতে পারে।
এফটির হাতে আসা চিঠিপত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পরও ২০২৬ সালে ‘সি৪৩০এল’ কর্মসূচি চলছিল। রাশিয়া তেহরানের জন্য কারিগরি প্রতিবেদন প্রস্তুত করছিল এবং কর্মসূচিটির পরবর্তী ধাপ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল।
২০২৬ সালের জুনে রোসোবোরোনএক্সপোর্টের একটি চিঠি থেকে জানা যায়, কর্মসূচির পরবর্তী ধাপের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তখনও আলোচনা চলছিল এবং রুশ কারিগরি প্রতিবেদন নিয়ে আরও আলোচনার পরিকল্পনা ছিল। তবে কর্মসূচিটির পরবর্তী ধাপ শুরু হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস
/অ